কে যেন ঘুর ঘুর করে (১৩)

 কে যেন ঘুর ঘুর করে (১৩)

আচ্ছা, আমি তো এতক্ষণ আমার ভাবনাবাবুর কথা তো বলেই যাচ্ছি, এই ভাবনাবাবুই কি তাহলে আমার স্বপ্নে দেখা ছায়ামূর্তি; হতে পারে। হয়ত সে আমারই কোনো অচেনা সত্তা, আমারই কোনো অমীমাংসীত আমসত্ত। আমার সব সমাধানের ভিতর ঢুকে, সব মীমাংসার ভিতর হানা দিয়ে সেই হয়ত এত খাবলা খাবলা হরিনাম তুলে নিতে চাইছে। আচ্ছা আমার ভাবনাবাবু কি প্রকৃতই বাবু না বিবি, ব্যাটাছেলে না মেয়েছেলে, নারী না পুরুষ, এসব তো ভেবে দেখিনি কখনো। আজ হঠাৎ ভাবতে হচ্ছে। শুনেছি একজন মানুষের মধ্যে নাকি নারী এবং পুরুষ দুটো সত্তাই থাকে। শ্রীচৈতন্য নাকি নিজের শরীরের মধ্যে একই সঙ্গে রাধা এবং কৃষ্ণের সত্তাকে অনুভব করেছিলেন। বুদ্ধের যুগনব্ধ রূপের কথা বলা হয়েছে, পুরাণে আছে শিবের অর্ধ-নারীশ্বর মূর্তির কথা। আর দেহতত্ত্বের গভীরে ঢুকে লোককবি তো বলেই দিয়েছেন ‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা মন জানো না’। যাই হোক, আমার ভাবনার মুখ চোখ নাক কিছুই দেখি না, কন্ঠস্বরও শুনি না, তবু তার সঙ্গে বাক্যালাপ হয়; অতঃপর একজন পুরুষ হিসেবেই ধরে নিচ্ছি আমার ভাবনাবাবুও পুরুষ, তবে অবয়বহীন। ভাবনাবাবু বলছেন আর আমি শুনছি, আমাত বিড়বিড়ানি শুনে তিনি আবার বললেন তিনি বললেন-হ্যঁ ঋত্বিক ঘটক, মনে আছে তিনি আরো কী বলেছিলেন, ‘‘যদি কোন শিল্পী একই জিনিস অনবরত দিয়ে যান, তবে বুঝতে হবে সে ভদ্দরলোকের ভিতরটা পচে গিয়েছে।”…তুই অনেক ভেবেও খুঁজে পাচ্ছিস না তো, হরপ্পা-সভ্যতার ভাঙাচোরার মধ্যে কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে, আর তাদের সিটি-স্ক্যান করার মতো তেমন কোনো মেশিন আছে কিনা! আমি ঘাড় নেড়ে বললাম,  ওহে ভাবনাকাজি, ঠিক বুঝতে বুঝতে পারছি না,  কিছু ক্লু দাও তো বাপু। ভাবনাবাবু মুচকি হেসে বললেন, আমি আপাতত হরপ্পা-সিলমোহরে খোদাই করা একটা মূর্তির নিয়েই তোকেয় ভাবতে বলব, মূর্তিটা সবাই চেনে, ওই যে পণ্ডিতেরা যাকে পশুপতির মূর্তি বলেছেন। ভাবনাবাবু বলামাত্র চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা যোগীমূর্তির ছবি, খাড়া হয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে যিনি বসে আছেন পদ্মাসনে, একালের যোগীরা যেমন বসে থাকেন; মূর্তিটার আসনের নীচে দুটো হরিণ, চারপাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে আছে হাতি মোষ বাঘ গণ্ডার। অর্থাৎ পশুবেষ্টিত। তার শরীরটা মানুষের কিন্তু মাথাটা কোনো পশুর, মাথার দুপাশে দুটো শিং। হুম, একে তো আমরা পশুপতির মূর্তি বলেই জানি। আদি শিব। ইতিহাস বইয়ে সেই রকমই যেন পড়েছি মনে হচ্ছে। ভাবনাবাবুকে বললাম সেকথা। ভাবনাবাবু বলল, ব্যাস, হয়ে গেল। আর কিছু নয়। বললাম, হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার আছে বটে, মূর্তিটার উত্থিত লিঙ্গ। ভাবনাবাবু বলছেন, আরো আছে,  আরো আছে, আচ্ছা বলতো, একটা মূর্তি যার শরীরটা মানুষের কিন্তু মাথাটা পশুর এটা সেই সময়ে কেমন করে সম্ভব হয়েছিল,  হরপ্পার যুগে কি প্লাসটিক-সার্জারি ছিল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে ভাবনাবাবুর সুরে সায় দিয়ে বললাম, হ্যাঁ, সেটা ঠিক। এর আগে তো কথাটা মাথায় আসেনি। ভাবনাবাবু বলেই যাচ্ছেন,  সেযুগে তো মানুষ যা করত সবই প্রকৃতিকে কপি করা, চারপাশে যা যা দেখবে তারই হুবহু নকল। কিন্তু দেহ মানুষের, মুণ্ডু পশু্‌র, এরকম মূর্তি তো প্রকৃতিতে নেই। তাহলে এটা হরপ্পার মানুষদের মাথায় এল কী করে?  তার মানে, যারা এটা বানিয়েছিল, তাদের মাথার মধ্যে কি তখন অন্য কিছু ঘুর-ঘুর করেছিল। যেমন তোর মাথায় এখন আমি ঘুর-ঘুর করছি? তারা কি, তাদের মতো করে, রিয়েলিস্টিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে কোনো অ্যাবস্ট্রাক্ট ভাবনার দিকে যেতে চেয়েছিল?  ভাবো কর্তা,  এটা নিয়েও ভাবা দরকার।           

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

| ১৪০০ সাল পত্রিকা | : কবিতা : মুরারি সিংহ

কে যেন ঘুর ঘুর করে (২)

কে যেন ঘুর ঘুর করে (১৬)

কে যেন ঘুর ঘুর করে (১৮)

কে যেন ঘুর ঘুর করে (১৫)

কে যেন ঘুর-ঘুর করে (৮)

কে যেন ঘুর ঘুর করে (১৭)

কে যেন ঘুর-ঘুর করে (৭)

কে যেন ঘুর-ঘুর করে (৬)