কে যেন ঘুর-ঘুর করে (৬)
কে যেন ঘুর-ঘুর করে (৬)
‘সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা
কয়!/ অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?...’, হ্যাঁ,
নিজেকে খুঁড়তে গিয়ে আবার জীবনানন্দকে স্মরণ করতে হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন,
এই একবিংশ-শতকে দাঁড়িয়ে আবার কেন সেই ‘বনলতা-সেন’-এর সৃষ্টিকর্তারই শরণ নিতে হল? উত্তরে
বলা যায়, মনের অলি-গলিতে উঁকিঝুঁকি মারতে গিয়ে, যদি দেখি কেউ আমার অন্তঃস্থলের খবর
জানে, তবে তার সঙ্গেই সখ্যতা তৈরি করব। তা সে জীবনানন্দ হতে পারেন, রজনীকান্ত হতে
পারেন, রবীন্দ্রনাথ হতে পারেন…বা আরো আগে…অনেক আগে…সেই বৈদিক যুগের মুনি-ঋষিরা। হ্যাঁ,
অবশ্যই বৈদিক-যুগ। আজ তবে বেদের কথাই বলা
যাক। আশ্চর্য এক সাহিত্য-সম্ভার এই বেদ, আরো আশ্চর্য সেই বেদের রচয়িতা আর্য-ভাষা
গোষ্ঠীর মানুষেরা। কোন এক বিদেশের মাটিতে থেকে গোরু-ঘোড়া চরিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে তারা
দলে দলে পা রাখতে শুরু করেছিল এই ভারতীয় উপমহাদেশের মাটিতে। তারা প্রথমে এসেছিল তাদের
পোষা গোরু-ভেড়াদের জন্য নতুন চারণ-ভূমির খোঁজে। কারণ তারা ছিল পশু-পালক জাত, সেই
অর্থে ফুড-গ্যাদারিং ম্যান, প্যাসটোর্যাল। তারা এসেছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডার দেশ থেকে,
যেখানে শীতের বরফ আর শুকনো হাওয়ার দাপটে গাছপালা-ঘাস সব নষ্ট হয়ে ফুরিয়ে যেত। সেই
দাপট থেকে বাঁচতে এই দেশের মাটিতে এসে তারা পেয়ে গিয়েছিল বিস্তীর্ণ বনভূমির সন্ধান;
বসবাসের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ; তার সঙ্গে এদেশের ভূমিপুত্রদের অঢেল ধন ও ঐশ্বর্য
দেখে তাদের চোখ কপালে উঠেছিল। অত্যন্ত লোভ ও নৃশংশতার সঙ্গে তারা এদেশের মানুষের উপর
নিজেদের দাপট দেখাতে শুরু করল। তাদের ধন-সম্পদ অবাধে লুঠ করতে লাগল, এদেশের অধিবাসীদের
দস্যু-নাম দিয়ে তাদের নির্বিচারে হত্যা করতে লাগল, অনেককে বন্দি করে দাস বানিয়ে
নিল। এই কাজে তাদের সাহায্য করল লোহার ব্যবহার সম্পর্কে তাদের জ্ঞান, লোহার
অস্ত্র-শস্ত্র এবং যুদ্ধের কাজে ঘোড়ার ব্যবহার; যা তখনো এদেশের মানুষের করায়ত্ব ছিল
না, যদিও সভ্যতার দিক থেকে এদেশের মানুষ অনেক এগিয়ে ছিল কারণ তারা ছিল উন্নত ও
সুপরিকল্পিত এক নাগরিক সভ্যতার অধিকারী। আর্যদের আরেকটা শক্তিশালী দিক ছিল তাদের
সুগঠিত ও উন্নত ভাষা। নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হলেও তাদের একটা ভাষাগত ঐক্য ছিল, যা এদেশের
অধিবাসীদের ছিল না, এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ভাষা ছিল আলাদা আলদা।। আর্যরা
সেই ভাষাতেই তাদের লুটপাট ও হত্যার কাজে সহযোগিতার জন্য নিজেদের কল্পিত দেবতাদের
কাছে প্রার্থনা শুরু করল। যজ্ঞের আগুনে নানা রকম হবি নিবেদন করে, মিষ্টি মিষ্টি কথায়
দেবতাদের তুতিয়ে-ভুতিয়ে সেই গৌরবর্ণের লোকেরা চাইল তাদের নরহত্যা ও লুণ্ঠনের কাজে
দেবতারা যেন তাদের আরো শক্তি ও আরো বল-ভরসা জোগায়। আর্যদের কল্পনায় প্রাকৃতিক শক্তিমাত্রেই
ছিল দেবতা। ফলে দেবতার সংখ্যাও ছিল বহু। ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের কামনা-বাসনাও নিবেদিত
হত সেই-সব দেবতাদের উদ্দেশ্যে। এইখানেই একদিন গোল বাধল। ঋষিদের একজন বলে বসল-‘কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম্ …’, সেদিন
হয়ত যজ্ঞস্থলে একসঙ্গে এত কাল্পনিক দেবতার সমারোহ দেখে সেই ঋষির মনের মধ্যেও এই
প্রশ্ন ঘুর-ঘুর করেছিল, এত দেবতা কেন… আমি কোন দেবতার উদ্দেশে হবিষ্যি নিবেদন করব?
মন্তব্যসমূহ